বুধবার ৮ ফাল্গুন, ১৪৩০ ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ বুধবার

পিঞ্জর খুলে দিয়েছি

গল্প : পিঞ্জর খুলে দিয়েছি

লেখক

ভানুলাল দাস

অবসরপ্রাপ্ত ডি়আইজি

জষ্ঠির শেষ। অঝর ধারায় বিষ্টি পড়ছে তো পড়ছে। চলবে আষাঢ় শাওন জুড়ে। দিনরাত বিষ্টির পানি টিপ টিপ পড়ছে। থামাথামি নেই। যেন আসমান চালুনির মত ছেঁদা ছেঁদা হয়ে গেছে। বাড়ি থেকে বের হবার জো নেই। পথে ঘাটে থকথকে কাদা। টাকনু অবধি গেড়ে যায়।
এই সময়টাতে বৃহত্তর সিলেট, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলার নিচু এলাকা পানিতে পানিতে সয়লাব হয়ে যায়। হাওড়, বিল, ঝিলে দিগন্ত বিস্তৃত থৈ থৈ পানি। দূরে বহু দূরে কিছু কলমি- লতা, কচুরিপানা আর জলজ আগাছার ঝোপ অস্পষ্ট চোখে পড়ে। হাওড় পাড়ের মানুষের মন তখন বড় আনমনা। কেমন কেমন করে মন। বিষন্ন দুপুর কিংবা পড়ন্ত বিকালে অথৈ পানির ঢেউয়ে ঢেউয়ে ভেসে আসে অদ্ভূত এক শব্দ। বিরামহীন মেঘ-মল্লার : টুপ টুপ…টুল্লুপ টুল্লুপ…।
এ হচ্ছে জলমোরগ বা কুড়ার ডাক। কুড়া ডাকছে। কেন ডাকছে? যৌবন মদমত্ত পুরুষ কুড়া এভাবেই কুড়িকে মিলনের আহ্বান জানায়। যখন একটানা ‘টুল্লুপ টুল্লুপ’ শুরু করে তখন বুঝতে হবে সে অন্য পুরুষ কুড়াকে মল্লযুদ্ধের চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। নারী আর পৃথিবী বীরভোগ্যা। দুই কুড়ার দ্বৈত মহা সমরে বিজয়ীর গলায় বরমাল্য পরিয়ে দেবে স্বয়ংম্ভরা যুবতী কুড়ি।
এই সময় কুড়া শিকারীর আনাগোনা শুরু হয়ে যায় । দূর দূরান্ত থেকে তারা আসে। রক্তে তাদের শিকারের নেশা। বংশানুক্রমে এই নেশা শরীরে ঢুকে। প্রথমে শিকারীরা কুড়ার পুরুষ বাচ্চা ধরে এনে পোষ মানায়। এই পোষা কুড়া খাঁচায় নিয়ে বুনো কুড়া শিকারে যায় তারা। বর্ষায় বুনো কুড়া মিলন আশায় ব্যাকুল ও বেপোরোয়া সাহসী। মৃত্যুকে ভয় পায় না। বুনো কুড়া তখন রণং দেহি অবস্থায় থাকে। যুদ্ধের ময়দানে পোষা ও বুনো দুটোই অবিরাম ‘টুল্লুপ টুল্লুপ’ করে রণ হুংকার দিতে থাকে: ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দেব সূচাগ্র ভূমি’। যুদ্ধের দামামা পুরোদস্তর বেজে ওঠলে শিকারী পালা কুড়াকে খাঁচা থেকে ছেড়ে দেয়। আর যায় কোথায়! বুনো আর পালা কুড়া মরণপণ সশস্ত্র লড়াইয়ে মেতে ওঠে। ধারালো নখ, ঠোঁট, পাখা দিয়ে প্রচন্ড আক্রমণ করে দুজন দুজনকে। একে অন্যকে ফালি ফালি করে ক্ষত বিক্ষত করে ফেলে। থেমে থেমে বিরামহীন হুংকার শুনা যায় দুপক্ষ থেকে – টুল্লুপ টুল্লুপ। যুদ্ধ শুরু হল তো হল। লুটোপুটি খাচ্ছে, একবার পানিতে ভাসছে, পরক্ষণে ডুবে যাচ্ছে, আবার ভাসছে। ঊড়ে ঊড়ে আকাশে, ডুবে ডুবে পানিতে, জড়াজড়ি করে ডাঙ্গায় লড়াই চলছে তো চলছেই। কেউ পালাবে না। হয় জয়, নয়তো যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যু। সংসপ্তকের মত। পালাতে জানে না।
এক পর্যায়ে পালা কুড়া নিজ পায়ের আঙুল দিয়ে ক্লান্ত আহত বুনোটিকে পায়ের আঙ্গুলে যুযুৎসুর প্যাচ মেরে মাটি কামড়ে পড়ে থাকে। তখন পোষা কুড়া ডাকাডাকি বন্ধ করে নিশ্চুপ থাকে। এবার শিকারী বুঝতে পারে বুনোকে পোষা কুড়া ধরে ফেলেছে। শিকারী কাল বিলম্ব না করে দৌড়ে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে দুটোকে ধরে ফেলে। পরে অনেক চেষ্টা করে পায়ের প্যাচ ছাড়াতে হয়।
শিকারীকে সাবধান থাকতে হয়; পোষা কুড়া বুনোটাকে যখন ধরে ফেলে , তখন বুনোটা ওকে প্রচন্ড মারধর দিতে থাকে। বেশি দেরি হলে বুনো কুড়া পোষাটিকে মেরেও ফেলতে পারে। তাই কুড়া শিকারী যতটা সম্ভব বুনো কুড়ার কাছাকাছি অবস্থান নিয়ে কুড়াকে ছাড়ে। যুদ্ধ চলাকালিন শিকারী খেতের আইল ধরে হামাগুড়ি দিয়ে, কখনো বা গলাপানিতে গা ডুবিয়ে কুড়াদের অনুসরণ করে। এখানেই শিকারীর চরম রোমাঞ্চ। শিকারের আদিম নেশায় তার রক্ত টগবগ করে ফুটতে থাকে।
বাহুল্য কথা আর না বাড়াই। আসল কথায় চলে আসি। করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচতে আমার এখন অজ্ঞাত বাস চলছে। গ্রামে। দেড় মাস হতে চলল। কিন্তু ভয় পিছু ছাড়ছে। করোনার এখন কমিউনিটি ট্রান্সমিশন চলছে। কার শরীরে কখন যে ঢুকে যাবে কেউ জানে না। শুনা যাচ্ছে গ্রামের বাজারে ৯ জনের কোভিট১৯ পজিটিভ পাওয়া গেছে।
গৈ গেরামের লোকজন করোনাকে একটুও পাত্তা দিচ্ছে না। তারা বলছে, করোনা বড়লোক আর পাপীতাপীদের বিনাশের জন্য এসেছে। এতে গরীবের কিচ্ছু হবে না।
আমার অবাক চাহনি দেখে আলাউদ্দিন ভাই চিল্লাইয়া কইলেন, বিশ্বাস হইল না তোমার? কোন রিকসাওয়ালা, কামলা- মজুর বা গার্মেন্ট শ্রমিককে করোনায় মরতে শুনেছো? মরছে যারা, সব শালারাই ঘুষখোর, দূর্নীতিবাজ, জুলুমবাজ।
আলাউদ্দিন ভাইয়ের দার্শনিক কথাবার্তার সেশন শেষ হতে না হতেই এই সাত সকালে আমার সামনে পাশের গাঁ সুন্দাইল পাড়ার এক কুড়া শিকারী। যুবকের বয়স ৩০/৩৫ হবে। তার হাতে ধরা পা-বাঁধা জলজ্যান্ত একটা কুড়া।
কথা নাই বার্তা নাই সে বলল, দাদা, এইডা আপনেরে দিতে আইছি।
-আমাকে?

  • হ্যাঁ। ৫/৬ দিন ঘুরাঘুরি কইরা এইডারে শিকার করছি।
  • কোত্থেকে?
  • আজিজ চেয়ারম্যানের বাড়ির সামনে, বৈশপাট্টার মাঠ থাইকা।
  • আমাকে কেন দেবেন।?
  • বারে! আপনে কত সম্মানী মানুষ! তাই মনে হইল আপনারে একটা পক্ষী দেই। আলমগীর চেয়ারম্যানরেও একটা দিছি।
  • আমি কুড়া নিয়া কি করব?
  • হা হা হা। কি করবাইন? জবাই কইরা খাইবাইন।
  • জবাই করে!
  • হায়! আল্লাহরে আল্লাহ। এতে আচানক হওয়ার কি দেখলাইন? ভালবাস্যা দিছি আপ্নেরে। জব কইরা খাওয়ার জন্য।
    কুড়াটিকে আমি ২দিন খাঁচায় রেখে দিলাম। মাছ দিলাম, ধান দিলাম। কিছুই খেল না। মাছ ও ধান যেমন ছিল তেমন পড়ে থাকল। অন্য এক শিকারীর কাছে তত্ত্ব নিলাম।
    কুদ্দুছ ভাই জানালেন, বন্য কুড়া এমনি বেতালা জীব যে, না খেয়ে মরে যাবে তবু খাঁচায় বন্দি থেকে খাদ্য মুখে নেবে না। এমনই জেদি পক্ষী কুড়া।
  • আপনে ঘুঘু ধরেন ১ দিন পর দানা খাইব। বক ধরেন ২ দিন পার হলে মাছ খাইব। কিন্তু কুড়া এমন বজ্জাত চিজ যে মইরা যাইব, তবু খাঁচায় আটকা থাইকা খাদ্য খাইত না।
    এই অভিজ্ঞ শিকারী আরও বললেন, ৫/৬ দিন না খাইয়া শুকাইয়া কাঠ হয়া যাইব, এর বাদে ফট কইরা মইরা যাইবো গা।
    একটু দম নিয়ে তিনি আমাকে পরামর্শ দিলেন, আইজ এক্ষুনি এইডারে জবাই কইরা ফেলাইন। এক পোয়া রসুন দিয়া কইতরের গোস্তের মত রাইন্ধা খায়া দেহেন। কি যে মজা! স্চু স্চু স্চু…।
    বাড়ি ফিরে খাঁচা থেকে কুড়াটিকে বের করলাম। হাতে চকচকে ছুরি। জবাই করব। পাখিটি ছোটোখাটো দেশি মোরগের সাইজের। পলকের জন্য পাখিটিকে দেখলাম। কী সুন্দর! সম্রাটের মত মাথায় হলুদ মেশানো লালচে মুকুট। গভীর ডাগর চোখে সংশয় আর ভীতি। ধারালো ঠোঁট দুটি চিকন হলদে। দু ডানায় কালোতে সাদার মিশেল। আধার রাতে চন্দ্র কলা আধেক সাদা আধেক কালা। লম্বা পা দুটি দেখার মত। রাজকীয় হলুদ পায়ে লম্বা লম্বা তীক্ষ্ণ ধারালো নখ। এ দিয়ে চেপে ধরলে যে কারও মাংশ ফালা ফালা করে দেবে মুহূর্তের মাঝে। আমি অবাক বিস্ময়ে তাকে দেখলাম। তার রূপ রং আকার আমাকে কেমন মুগ্ধ করে দিল। জবাই করতে ভুলে গেলাম। হাতে ছুরি ধরাই থাকল। এরিমধ্যে আমার বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলে এসে বাধ সাধল।
  • কি করছ, কি করছ?
    আমি হাতের চকচকে ছুরির দিকে তাকালাম।
  • ওটাকে তুমি মারবে? কিন্তু কেন? ওর দোষ?
  • দোষগুণ জানি না। আমি নয়নরে আধা কেজি রসুন কিনতে পাঠিয়েছি। এই এল বলে!
  • ওতো কোন যুক্তি হল না?
  • যুক্তি? বুনো পাখিকে মারব, সোয়াদ করে খাব, এতে আবার যুক্তিটুক্তি কি? আজকাল কি স্ট্যাটিস্টিকসে যুক্তিবিদ্যা পড়ানো হচ্ছে নাকি?
  • শোনো বাবা, ও তোমার কোন ক্ষতি করেনি। কারও জায়গা জমি দখল করেনি। চুরি ডাকাতি করেনি। বরং তোমার আমার মত মানুষরা ওদের আবাসভূমি নষ্ট করেছে। বিনা দোষে ওদের ধরে ধরে হত্যা করে চলেছে। এ ভারি অন্যায়, বাবা।
    আমি ফ্যাল ফ্যাল করে পুত্রকে দেখি। জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজার হাজার পরিযায়ী পাখির দল আসে। ছাত্র ছাত্রীরা বড় মায়া দেখায় পাখিদের। ভালবাসে ওদের। শুধু করোনা ভাইরাস নয়, ভালবাসাও বড় সংক্রামক। আমার পুত্রের ভেতর জাহাঙ্গীর নগরের ছেলেমেয়েদের পাখি-প্রেম সংক্রমিত হয়েছে।
    সে এগিয়ে এল। ধমকের সূরে বলল, ওকে আমার হাতে দাও।
    আমি দেখলাম পিতা পুত্রের সংঘাত আসন্ন। কুড়া নিয়ে। পাখিটা তার হাতে দিলাম। সে মাথায় শরীরে আদরের হাত বুলাল। বার কয়েক।
  • ওটা নিয়ে তুই কি করবে শুনি?
  • রাতে মাঠে ছেড়ে দেব।
  • ছেড়ে দেবে!
  • হ্যাঁ।
    রাতে ছেলে আমাকে ডেকে নিল। মিশমিশে অন্ধকার। নয়টা বাজে। এক হাতে কুড়ার খাঁচা আর হাতে টর্চ লাইট। আমি নিরবে অনুসরণ করি তাকে। আল ধরে হাঁটছি। ছিপছিপ পানি। জুতা ভিজে গেছে। হাঁটতে হাঁটতে বিলের কাছে চলে এলাম। টর্চ লাইটের আলোতে দেখলাম বিলের থৈ থৈ পানি ফকফক করছে। খাঁচার দরজা খুলে পক্ষিটিকে বের করে আমার হাতে দিল। জড় ভরতের মত আমি পাখিটাকে হাতে নিলাম।
  • আমি এক থেকে পাঁচ কাউন্ট করব। একশান বলার সাথে সাথে আকাশে ঊড়িয়ে দেবে। বুঝলে?
    আমার জবাব না শুনেই গণতে শুরু করল, ওয়ান, টু, থ্রি…একশান।
    আমি পাখিটাকে উর্ধমুখে ছুড়ে দিলাম।
    অন্ধকার রাতে পাখিটা পত পত শব্দে জোর ঊড়াল মারল। তারপর ঝাপ করে জলে পড়ল। পরক্ষণেই ডুব দিল। টর্চের আলো কুড়াকে অনুসরন করছে। মুখে কিছু একটা নিয়ে ভাসল পাখিটা। দুইবার পাখা ঝাড়ল। তারপর তীব্র বেগে পানি উপর দিয়ে তীরের মত ছুটে গেল। এবং অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
  • এবার ফেরা যাক, বাবা।
    বাড়ির কাছাকাছি ফিরতেই বিষ্টির রাতের নিস্তব্ধতাকে কাঁপিয়ে পাখি ডেকে ওঠল, টুল্লুপ টুল্লুপ টুল্লুপ…।
    আমার গা শিউরে ওঠল। আতংকে, নাকি উল্লাসে বুঝতে পারলাম না। এইটুকু শুধু উপলব্ধিতে এল, পাখিটিকে জবাই করা হত অনুচিত ও চরম নিষ্ঠুরতা।
    পরদিন সকালে শিকারীর মোবাইল।
  • দাদা! পক্ষিটা কেমন স্বাদ লাগল। বেশি করে রসুন দিয়েছিলেন তো?
    আমি নিশ্চুপ। কী বলব? যদি বলি জবাই না করে ছেড়ে দিয়েছি, লোকটি কি খুশি হবে? বহু কষ্ট করে ধরা পাখিটি না খেয়ে ঊড়িয়ে দিয়েছি! ভালবাসার এমন নিষ্ঠুর অপমান কি তার পাওনা ছিল?
    -হ্যালো দাদা, হ্যালো…স্বাদ লাগেনি?
    আমি নিরুপায় হয়ে মিথ্যা বললাম, খুব স্বাদ লেগেছে।
  • হা হা হা। আমি জানতাম, আপনে এর গোসত ভালা পাইবাইন। আরও কিছুদিন আছেন তো? আর একটা ধরলে আপ্নেরে দিয়া যামু। না না। টেকা লাগবো না। ভালবাস্যা দিলে কেউ টেহা নেয় নি…?

শিকারীর বাকি কথাবার্তা আমার কানে আর পৌঁছল না। মনে মনে শুধু ভাবতে থাকি, মিছা কথা বলে এত সুখ!

————————————————————

Categories: খোলা বাতায়ন,চিত্র-বিচিত্র,ফিচার,সাহিত্য

Leave A Reply

Your email address will not be published.